Sponser

রুমা ও রিজুক রোমাঞ্চ, ২০০৯

ভ্রমণ
PUBLISHED: May 31, 2021

স্কুলের ভূগোল বইয়ে পড়েছিলাম বাংলাদেশের জলপ্রপাত একটি, মৌলভীবাজারের বড়লেখার মাধবকুন্ড। ওখানে ঘুরেও এসেছিলাম। তারপরই কোথায় যেন দেখলাম, রিজুক নামেও একটি জলপ্রপাত আছে, সেটা বান্দরবানে। তখনই সেখানে যাওয়ার ইচ্ছা ডাল-পালা মেলতে লাগল। তবে সুযোগ মিলল অন্তত এক যুগ পরে। মার্চ, ২০০৯। প্রথম আলোতে কাজের সূত্রে পরিচয় ও বন্ধুত্ব রিদওয়ান আক্রামের সঙ্গে। ওকে নিয়েই বেরিয়ে পড়লাম পার্বত্য চট্টগ্রাম অভিযানে। বান্দরবান থেকে প্রথম যাই রুমায়, রিজুক দেখতে। সেই গল্পই শুনাব।রুমা বাজারের সামনের ঘাট থেকে রিজুকের উদ্দেশ্যে নৌকা ছাড়তে ছাড়তেই বেজে গেল সোয়া তিনটা। এত দেরি কেন? প্রথম ফ্যাকড়া বাধে বান্দরবানের রুমা স্টেশনে, যখন অল্পের জন্য দিনের প্রথম চান্দের গাড়ি ধরতে ব্যর্থ হলাম। সোয়া দশটার দ্বিতীয় গাড়িতে করেই রওয়ানা হই রুমার উদ্দেশ্যে। উঁচু-নিচু পাহাড়ি পথে চলার সময় ঝাঁকুনির চোটে শরীরের হাড়-মাংস এক হওয়ার জোগাড় হলেও দুই পাশের পাহাড়, সেখানে নানান গাছপালার রাজত্ব, বুনো গন্ধ, প্যাঁচালো রাস্তায় রোমাঞ্চকর যাত্রা, নিচে সরু ফিতার মতো দেখা যাওয়া সাঙ্গু নদী, একটু পরপরই ঢং ঢং শব্দে প্রায় শুকিয়ে যাওয়া ছড়ার ওপর সেতু অতিক্রম-সব মিলিয়ে ভ্রমণটাতে উত্তেজনার কমতি ছিল না।

রুমা এসে আরেক বিপত্তি। জানতে পারলাম নৌকায় করে সাঙ্গু নদী ধরে এক ঘন্টা লাগবে রুমা বাজারে পৌঁছাতে। কারণ চান্দের গাড়ি আর সামনে যাবে না, সেতুটা ভাঙা। এটা অবশ্য বছর দুয়েক আগে নতুন করে তৈরি হয়েছে। চান্দের গাড়ি থেকে নামা এক রুমাবাসী মুশকিল আসান করলেন, বললেন নৌকায় না গিয়ে, নদী-ডাঙ্গা মিলিয়ে হেঁটে গেলে মিনিট কুড়ি-পঁচিশের মধ্যে পৌঁছে যাবো রুমা বাজারে। তা-ই করি, শেষ পর্যন্ত রুমা বাজারে পৌঁছাতে পৌঁছাতে বেলা দুইটা। পথে মারমা, বম নারী-পুরুষদের দেখলাম পাহাড়ে কাজ করছে। অনেকে আবার হেঁটে যাচ্ছে আমাদের মতোই নদীর পাড় ধরে। দেরি হওয়ায় ধরে নিয়েছিলাম, আজ বোধহয় আর রিজুক দর্শন হচ্ছে না। কিন্তু এরপরই ত্বরিত ব্যবস্থা নিয়ে মুখে হাসি ফুটালেন আমাদের অপেক্ষায় থাকা শৈহ্লাচিং মারমা। তাঁকে ঠি করে দিয়েছিলেন বুদ্ধজ্যোতি দা। সেই সূত্রেই আমরা নৌকায়, রিজুকের পথে। সঙ্গে শৈহ্লাচিং মারমা ছাড়াও চলল চান্দের গাড়িতে পরিচয় হওয়া দুই যুবক মিজান ও নবিদুর। নৌকার দুই কিশোর মাঝি মিটন আর উজ্জ্বল তো আছেই!দু-চারটি দরকারি তথ্য জেনে নেওয়া যাক। বান্দরবান থেকে রুমা যেতে লোকাল চান্দের গাড়ি বা বাসই ভরসা। অবশ্য লোকজন বেশি থাকলে চান্দের গাড়ি রিজার্ভও করে নিতে পারেন। রুমা থেকে রিজুক যাবেন হেঁটে কিংবা নৌকায়। কোনটি জলপ্রপাত আর কোনটা ঝরনা এই নিয়ে আমার মনে একটা কৌতূহল কাজ করে সব সময়। এটা ধন্দে সম্ভবত অনেকেই পড়েন। ২০০৯ সালে ধারণা ছিল আকারে যেগুলো বড় এবং অনেক উঁচু থেকে পড়ে সেগুলোই বোধহয় জলপ্রপাত। তবে এখন ঘাঁটাঘাঁটি করে যা বুঝলাম ব্যাপারটা আলাদা। মাটি ওপর প্রবাহিত পানির ধারা, যেমন ছোট-বড় নদী-ছড়া কিংবা অন্য কোনো প্রবাহ হঠাৎ পাহড়ের খাড়া প্রান্ত থেকে নিচে পড়ে জলপ্রপাতের জন্ম। অপর দিকে মাটির নিচে জমা হওয়া পানি কোনো শক্তির প্রভাবে পাহাড় কিংবা সমতল ফুঁড়ে বেরিয়ে এলে সৃষ্টি হয় ঝরনার। অর্থাৎ ঝরনা যে সবসময় জলপ্রপাতের মতো উঁচু জায়গা থেকে পড়বে তার গ্যারান্টি নেই। তার মানে রিজুক, নাফাখুম, জাদিপাই এগুলোকে আমরা জলপ্রপাতই বলতে পারি।

ফিরে আসি মূল কাহিনিতে। রুমা থেকে রিজুকের দুরত্ব বেশি নয়, মোটে পাঁচ কিলোমিটার। সাঙ্গুতে পানি একেবারেই কম। নিচে বালু দেখা যাচ্ছিল পরিষ্কার। কখন বালুর চড়ায় আটকে যায় এই ভয়ে মাঝিদের নৌকা চালাতে হচ্ছে সাবধানে। নদীতে হাঁটুজলে শামুক খুঁজছে মারমা কিশোরীরা। ডানে পাহাড়, বায়ে বেশ কিছু জায়গাজুড়ে ফসলের ক্ষেত। এখন খুব একটা চোখে পড়ছে না, তবে রুমা বাজারের দিকে হেঁটে যাওয়ার পথে প্রচুর বাঁশের চালি চোখে পড়েছে সাঙ্গুর বুকে। ভেলা বানিয়ে নদীর স্রোতে ভাসিয়ে দিয়ে বহু দুরে নিয়ে যাওয়া হয় বাঁশ। আমাদের সামনে দিয়ে সাঙ্গু পার হয়ে গেল জনা কয়েক মারমা নারী। পিঠে ঝোলানো ঝুড়ি।
দুই মাঝির একজন উজ্জ্বল চুপচাপ, তবে মিটনের মুখে খই ফুটছে। জিজ্ঞেস করতেই বলল পাহাড়ে মায়া হরিণ, বানর আছে। হঠাৎ হঠাৎ সম্বরও চোখে পাড়ে। পাহাড়ি শিকারিরা কখনো কখনো দলবেঁধে বের হয় হরিণ বা বুনো শুকর শিকারে। আবার জুমের ক্ষেতের আশপাশে নানা ধরনের ফাঁদ পেতেও শিকার করে। যখনকার কথা বলছি তখনই রুমা এমনকী বগা লেক কেওক্রাডংয়েও বন্যপ্রাণীর অবস্থা খুব ভালো ছিল না। এখন সম্ভবত একেবারেই ফাঁকা হয়ে গিয়েছে।
নদীতে এমনিতে কোমড় জল হলেও কোথাও কোথাও গর্ত মতো, সেখানে জল বেশি। আমরা নেমে পানিতে হাঁটি। একসময় এমন এক জায়গায় চলে এলো নৌকা, যেখানে পানি বেশি না হলেও স্রোত প্রচণ্ড, পরিষ্কার টলটলে পানির নিচে ছোট ছোট নুড়ি পাথরের রাজত্ব। তারপর আরও কিছুটা জলপথ পেরোতেই কানে এলো ঝিরঝির শব্দ, পরক্ষণে দূরে দেখা দিল রিজুক। এখান থেকে কেমন নীলচে দেখাচ্ছে পানির ধারা। জলপ্রপাতের সামনে পৌঁছাতেও সময় লাগল না। কাছ থেকে দেখে মজে গেলাম রিজুকের রুপে।
পাহাড়ের আনুমানিক ২০০ থেকে ২৫০ ফুট ওপর থেকে নেমে আসছে জলের ধারা। শুকনো মৌসুম, তারপরও বেশ ভালো পরিমাণ জলই নদীতে ঢেলে যাচ্ছে রিজুক। গতি, উদ্যমতায়ও কমতি নেই। জলপ্রপাতের কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই বর্শার ফলার মতো শরীরে বিধতে লাগল শীতল পানি। মিষ্টি একটা অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ল শরীরময়। যেখান থেকে নামছে পানির ধারা, সেখানে জংলি গাছপালার ঠাসবুনোট। শৈহ্লাচিং মারমা জানাল, রিজুকের উল্টো পাশে নতুন রিজুকপাড়া নামে মারমাদের একটা পাড়া আছে। এ পাশে পাহাড়ের ওপর বমদের পাড়াটির নাম রিজুকপাড়া।
পাহাড় বেয়ে উঠতে থাকি বম পাড়ার উদ্দেশ্যে। গাছ কুঁদে বমদের বানানো সিঁড়ি সহজ করে দিল কাজ। একটু পরেই পাহাড়ের মাঝখানে খোলামেলা একটা জায়গায় উঠে এলাম। এখান থেকে ক্রমেই ম্লান হতে থাকা সূর্যের আলোয় চারপাশের পাহাড়, নিচের সাঙ্গু নদী, অপূর্ব লাগছিল। ভেবেছিলাম ওপরে বমদের পাড়ায় উঠব, পরিচিত হবো তাদের সঙ্গে, কিন্তু সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসায় ধরতে হলো নিচের ঢালের পথ।
আরও একবার মন ভরে রিজুককে, সাঙ্গুর বুকে জমা হতে থাকা তার জলের ধারাকে দেখে নিয়ে উঠে বসলাম নৌকায়। মিটন জানাল, ঘোর বর্ষায় রিজুক সাঙ্গুর বুকে এত্তো জল ঢালে যে স্রোতের তীব্রতায় জলপ্রপাতের ধারে পৌঁছতে এমনকী বড় ইঞ্জিনের নৌকারও বেগ পেতে হয়। তখন রিজুক আরো সুন্দর! রিজুকের সুন্দর একটি মারমা নামও আছে, রী স্বং স্বং।
ফিরতে ফিরতে আঁধার নেমে যায়, চাঁদের আলোয় দুই পাশের পাহাড়, নদীর জল মায়াময় রহস্যময়তার আশ্চর্য এক অনুভূতি এনে দিয়েছিল মনে। সেই সঙ্গে একটু পর পরই অন্ধকারে ঠাহর না পেয়ে বালুর চড়ায় নৌকা আটকে যাওয়ায় দুশ্চিন্তা হচ্ছিল খুব। শেষমেষ যখন শহরের পৌঁছালাম তখন অন্ধকার আরও জেঁকে বসেছে।
তখন রুমায় পাশাপাশি দুটে মোটামুটি চলনসই হোটেল ছিল। আমরা যেটায় উঠেছিলাম সেটার নাম খুব সম্ভব হিলটন। সাফ-সুতোর হয়ে বেড়া-টিনের একটা রেস্তোঁরায় সেরেছিলাম রাতের খাবার। দিনভর পরিশ্রমের কারণে নাকি বাবুর্চির মুন্সিয়ানায় বলতে পারব না, অসম্ভব সুস্বাদু লেগেছিল খেতে। এতোটাই যে কড়া ঝালের মুরগি, সবজি আর ডাল ছিল ম্যানুতে ভুলিনি এতো বছরেও।
রুমার ওই রাতে আমার বড্ড আক্ষেপ হয়েছিল। রিদওয়ানের কোমড় ব্যথা উঠেছিল, একটা খাটের ফোম নামিয়ে কাঠের ওপর শুয়েছিল। আর আমি? রওয়ানা দেওয়ার সময় জামিল ভাই আচমকা জানালেন, একটা অ্যাসাইনমেন্ট শেষ করে পাঠাতে হবে, প্রথম আলোর বান্দরবান প্রতিনিধি বুদ্ধজ্যোতি চাকমা ওটা কম্পোজ করে মেইলে পাঠাবেন তাঁকে। ওটাই লিখছিলাম বসে বসে, বার বারই মনে হচ্ছিল, রাতের রুমা আর চৌহদ্দির কোনো পাহাড়ে ঘুরা যেত যদি আকস্মিক কাজটা ঘাড়ে না চাপত। এর মধ্যে রিদওয়ান একবার নিচে নেমেছিল, কিন্তু সঙ্গীহীনতা আর কোমড়ের ব্যথা দুইয়ে মিলিয়ে ফিরে আসে। একটু পর পরই বারান্দায় গিয়ে অন্ধকারের দিকে তাকিয়েছি, তখন মনে পড়েছে শৈহ্লাচিং দাদার কাছ রুমার বন-পাহাড়ের বন্যপ্রাণীদের তালাশ নেওয়া হয় নি। এখনো কী পাহাড়ের গুহায় আস্তানা আছে দু-একটা চিতা বাঘের?
২০০৯-এ রিজুককে তেমন চিনত না মানুষ। তাই পরিবেশ ভালো ছিল, অন্তত জলপ্রপাতের আশপাশে কোনো আবর্জনা চোখে পড়েনি। তবে শৈহ্লাচিং দাদা বলেছিলেন পাহাড়ে গাছ কাটার ফলে ঝরনার প্রবাহে বাধা পড়ছে। জানি না এখন কী অবস্থা, আশা করি পর্যটকরা রিজুকের আশপাশটা পরিচ্ছন্ন রাখবেন।
রিজুকের ভালো ছবি দিতে না পারায় দুঃখিত। ওই বার ছবি তুলেছিল রিদওয়ান,@Ridwan Akram ঝরনার ছবি যে ফোল্ডারটায় ছিল ওটার হদিস মিলছে না। ঝরনার যে ছবিটা দিলাম, সেটাও হার্ড কপি থেকে তোলা।
Recommended For You

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *