Sponser

গাছে ওপর কারা থাকে

অদ্ভুত
UPDATED: September 12, 2020

করোওয়াইদের গল্পটা আমার ভালো লেগেছিল। প্রথম পড়েছিলাম খুব সম্ভব রিডার্স ডাইজেস্টে। তারপর কেটে গেছে প্রায় দেড় যুগ। পরের বছরগুলোতে টুকটাক পড়া হয়েছে, ডকুমেন্টারি দেখা হয়েছে ওদের নিয়ে। তবে কেন যেন লেখা হয়নি এই বিচিত্র মানুষদের কাহিনি। সভ্যতার স্পর্শ পায় নি এমন মানুষদের কথা ভাবতে গেলে আমাজনের জঙ্গলের আদিবাসীদের কথাই মাথায় চলে আসতো আমার। তবে এই ধারণা বদলে দেয় করোওয়াইরা। আমাদের এশিয়া মহাদেশেই বাস, দক্ষিণ-পূব ইন্দোনেশিয়ার পাপুয়া প্রদেশের গহীন অরণ্যে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বুনো জন্তু শিকার ও জংলি ফল-মূল, লতা-পাতা সংগ্রহ করে জীবন ধারন করছে। বিংশ শতাব্দীর সত্তরের দশক পর্যন্ত নিজেরদের এই গভীর বনানীর জগত ছাড়া আর কোনো পৃথিবী আছে এটা ভাবতেও পারত না ওরা, তেমনি ওদের কথা জানত তা গোটা দুনিয়ার মানুষও। তারপরই ১৯৭৪ সালে ডাচ মিশনারীরা খুঁজে বের করে তাদের। অনুমান করা হয়েছিল করোওয়াই পৃথিবীর সর্বশেষ সম্প্রদায় যারা নরমাংসভোজন করে। পিলে চমকানো খবরটা এতোটাই তোলপার তেলে যে আরেকটু হলে এর আড়ালে ঢাকা পড়তে বসেছিল এই অরণ্যচারী আদিবাসীদের অনন্য আরেক বৈশিষ্ট্য। আমার মতে করোওয়াইদের নিয়ে গল্প গাঁথার সবচেয়ে বড় উপাদান এটাই, উঁচু উঁচু গাছে বাস তাদের, তাও অসাধারণ স্থাপত্যকর্মের দৃষ্টিনন্দন সব ঘর বানিয়ে। আমার করোওয়াইতে মজে যাওয়ার কারণও এটি। গাছবাড়িতে থাকার সাধ বহু দিনের। পর্যটক টানতে কোনো কোনো দেশের দু-একটি রিসোর্টে এখন গাছে রাত কাটানোর চমৎকার ব্যবস্থাও হয়েছে। বাংলাদেশেও হয়তো অচিরেই হবে। কিন্তু দেখুন শত শত বছর ধরে প্রয়োজনের তাগিদেই এমন বাড়িতে থেকে আসছে এই আদিবাসীরা।করোওয়াইদের এই গাছবাড়িগুলো কতটা উঁচুতে? সাধারণত ২০ থেকে ৪০ ফুট উচ্চতায় দেখা পাবেন এমন বাড়িগুলোর, তবে ১১৪ ফুট উঁচুতে বানানোর রেকর্ডও আছে। একটি গাছেই তৈরি হয় ঘরটি, কখনো কখনো কয়েকটি জীবন্ত গাছের ওপর থাকে ভিতটা, বাড়তি সাপোর্ট হিসাবে থাকে কাঠের খুঁটি। এই গাছবাড়ি বাসিন্দাদের যে শুধু নিচে গিজগিজ করতে থাকে অগুণিত রক্তলোভী মশার কবল থেকে বাঁচায় তা নয়, বাঁচায় প্রতিহিংসাপরায়ণ প্রতিবেশী এবং তাদের সবচেয়ে ভয়ের কারণ অশুভ আত্মাদের থেকেও! এমন একটি বৃক্ষবাড়ি বানাবার জন্য প্রধান খুঁটি হিসাবে একটি শক্তপোক্ত বট গাছ বাছাই করা হয়। গাছের ওপরের অংশটা কেটে ফেলা হয়। তারপর চারপাশে ছোট ছোট খুঁটি বসানোর কাজ চলে। গাছের ডাল-পালা দিয়ে মেঝের কাঠামেটা দাঁড় করানোর পর ঢেকে দেওয়া হয় সাগো পামের শক্ত পাতা দিয়ে। দেয়াল এবং ছাদ তৈরিতেও লাগে ওই সাগো পামই। ডালপালাগুলো একটার সঙ্গে আরেকটা আটকানোর উপাদান বেতজাতীয় রত্তন গাছ। বাড়ির মেঝেটা মজবুত হওয়া চাই, অনেক সময় এক একটা বাড়িতে ডজনখানেক মানুষ বাস করে। নারী-পুরুষ-শিশুর সঙ্গে পোষা প্রাণী মায় গবাদিপশুরও ঠাঁই হয়। খাঁজকাটা একটা গাছের গুড়ি উঠানামার জন্য মই হিসাবে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। বড় বাড়িগুলোতে নারী-পুরুষের থাকার আলাদা জায়গা এমনকী আগুন জ্বালানোর কামরা থাকে। আগুনে পুড়ে যাওয়াই এই সবুজ আস্তানার প্রধান সমস্যা, তবে এমনিেও এ ধরনের এক একটা বাড়ি পাঁচ বছরের বেশি টেকে না।শয়তান, পাপিষ্ঠ আত্মা,বান বা তুকতাক, মৃত্যু এসব নিয়ে অন্ধ বিশ্বাসই নরমাংসভোজনের দিকে ঠেলে দিয়েছিল করোওয়াইদের। কোনো অপরাধ বা যাদুটোনার জন্য কারো প্রাণদন্ড হলে তার মাংস খাওয়ার রীতির চল ছিল কালো জাদুর প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের সদস্যদের। ২০০৬ সালে ‘সিক্সটি মিনিটসে’র রিপোর্টাররা ‘শেষ নরমাংসভোজীদের’ জীবন ধারণ করতে গহীন অরণ্যে ঢুকে। প্রচারের পর দারুণ জনপ্রিয়তাও পায় তথ্যচিত্রটি। তবে নৃ-বিজ্ঞানী ও স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য বলছে, শোরগোল তোলার উদ্দেশ্যেই এভাবে নরমাংসভোজনের ব্যাপারটা প্রচার করা হয়েছে, তথ্যচিত্রটি তৈরির অন্তত দুই যুগ আগ থেকেই পূর্বপুরুষদের পালন করা ওই বর্বর অভ্যাস থেকে সরে এসেছে করোওয়াইরা। সভ্য জগতের সঙ্গে যোগাযোগ হওয়াটা হয়তো অশনি সংকেতই দিচ্ছে। তরুণরা এখন তাদের অরণ্যবাস ছেড়ে শহরমুখী হচ্ছে। মোটের ওপর মাত্র ৩-৪ হাজার করোওয়াই টিকে আছে, আশংকা করা হচ্ছে আর হয়তো কেবল একটা প্রজন্মই এই আশ্চর্য জীবনধারা ধরে রাখতে পারবে। লেখক ও অ্যাডভেঞ্চারার উইল মিলার কয়েকবারই ঘুরে এসেছেন আদিবাসীদের জঙ্গলের আস্তানা থেকে। বিবিসি তঁর অভিজ্ঞতা নিয়ে বানিয়েছে তথ্যচিত্র। মিলার মারফতই জানা যায় হতাশাজনক এক তথ্য। সিংহভাগ করোওয়াই এখন ঐতিহ্যবাহী গাছবাড়িতে বাস করে না, বরং পর্যটক আকৃষ্ট করতে ব্যবহার করে তাদের বৃক্ষনিবাসসহ ঐতিহ্যের নানান অনুষঙ্গ! তবে কি আদিম জীবন যাপনের ধারাবাহিকতা নিয়ে টিকে থাকা শেষ আদিবাসীগোত্রগুলোর একটি, করোওয়াইও অচিরেই পুরোপুরি হারাতে বসেছে ঐতিহ্য।

Ishtiaq Hasan

1111

Recommended For You

7 thoughts on “গাছে ওপর কারা থাকে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *